স্ক্যাবিস কী? কেন হয়, কীভাবে ছড়ায় ও প্রতিকারে ঘরোয়া উপায়।
![]() |
| স্ক্যাবিস প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায় |
স্ক্যাবিস (Scabies) একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত বিরক্তিকর এবং ছোঁয়াচে চর্মরোগ, যা সারকোপ্টেস স্ক্যাবিই (Sarcoptes scabiei) নামক ক্ষুদ্র পরজীবীর কারণে হয়।এটি অত্যন্ত চুলকানিযুক্ত এবং খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। যথাযথ চিকিৎসা ছাড়া এই রোগ সহজে সারে না এবং সহজেই পরিবারের অন্যান্য সদস্য বা ঘনিষ্ঠ মানুষদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। চলুন জেনে নেই স্ক্যাবিস সম্পর্কে বিস্তারিত।
স্ক্যাবিস কেন হয়?
স্ক্যাবিস হওয়ার মূল কারণ হলো সারকোপ্টেস স্ক্যাবিই মাইট দ্বারা ত্বকের সংক্রমণ। এই মাইটগুলো ত্বকের উপরিভাগে বাসা বাঁধে এবং স্ত্রী মাইট ত্বকের গভীরে ক্ষুদ্র সুড়ঙ্গ তৈরি করে ডিম পাড়ে। মাইটের চলাচলের পথ, তাদের মল এবং ডিমের প্রতি শরীরের অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ার ফলেই এই অসহনীয় চুলকানি হয়।
স্ক্যাবিসের প্রকারভেদ
স্ক্যাবিস সাধারণত এক ধরনেরই হয়, তবে এর প্রকাশের ধরন এবং তীব্রতা অনুসারে কিছু বিশেষ নামে পরিচিতি লাভ করেছে:
সাধারণ স্ক্যাবিস (Typical Scabies): এটি স্ক্যাবিসের সবচেয়ে সাধারণ প্রকার, যেখানে ত্বকে তীব্র চুলকানি, ছোট ছোট লালচে ফুসকুড়ি এবং মাইটের তৈরি সুড়ঙ্গ দেখা যায়। এটি সাধারণত আঙুলের ফাঁকে, কব্জি, কনুই, বগল, কোমরের ভাঁজ এবং যৌনাঙ্গে বেশি হয়।
নর্ডিক বা ক্রাস্টেড স্ক্যাবিস (Crusted or Norwegian Scabies): এটি স্ক্যাবিসের একটি গুরুতর এবং বিরল রূপ। এক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বকে প্রচুর পরিমাণে মাইট থাকে। এটি সাধারণত দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পন্ন ব্যক্তি যেমন - এইচআইভি/এইডস রোগী, বয়স্ক ব্যক্তি, ডাউন সিনড্রোম রোগী বা যারা স্টেরয়েড ঔষধ সেবন করেন, তাদের মধ্যে দেখা যায়। এই ধরনের স্ক্যাবিসে ত্বকে মোটা, ক্রাস্টেড বা আঁশযুক্ত ক্ষত তৈরি হয়, যা প্রায়শই সোরিয়াসিস বা একজিমার মতো দেখায়। এই প্রকার স্ক্যাবিস অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এতে চুলকানি কম হতে পারে, যা রোগ নির্ণয়কে জটিল করে তোলে।
নডুলার স্ক্যাবিস (Nodular Scabies): কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে, ত্বকে লালচে বা বাদামী রঙের চুলকানিযুক্ত নোডিউল বা ছোট ছোট পিণ্ড দেখা যেতে পারে। এই নোডিউলগুলি সাধারণত বগল, কুঁচকি এবং যৌনাঙ্গের চারপাশে হয়। এগুলি মূলত মাইট এবং তাদের বর্জ্যের প্রতি শরীরের ইমিউন প্রতিক্রিয়ার ফল। মাইট মারা যাওয়ার পরেও এই নোডিউলগুলি কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে থাকতে পারে।
স্ক্যাবিসের লক্ষণ
স্ক্যাবিসের লক্ষণগুলি সাধারণত মাইট দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ২-৬ সপ্তাহের মধ্যে দেখা যায়। তবে পূর্বে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে লক্ষণগুলি দ্রুত, এমনকি কয়েক দিনের মধ্যেই প্রকাশ পেতে পারে। লক্ষণগুলো নিম্নরূপ:
তীব্র চুলকানি: এটি স্ক্যাবিসের প্রধান এবং সবচেয়ে বিরক্তিকর লক্ষণ। রাতে, বিশেষ করে বিছানায় উষ্ণতার কারণে চুলকানি আরও বেড়ে যায়।
ত্বকে ফুসকুড়ি: ছোট ছোট লালচে ফুসকুড়ি, ব্রণ বা ছোট ছোট জলযুক্ত ফোস্কার মতো দেখা যায়।
মাইটের সুড়ঙ্গ: ত্বকের উপরে আঁকাবাঁকা, সরু, ধূসর বা লালচে রেখা দেখা যেতে পারে। এগুলি মাইটের তৈরি সুড়ঙ্গ। সাধারণত আঙুলের ফাঁকে, কব্জিতে, কনুইতে, বগলে, স্তনের নিচে, নাভির চারপাশে, যৌনাঙ্গে এবং নিতম্বে এগুলি বেশি দেখা যায়।
ক্ষত এবং সংক্রমণ: অতিরিক্ত চুলকানোর ফলে ত্বকে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে এবং এতে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ (যেমন ইমপেটিগো, সেলুলাইটিস) হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এতে জ্বর বা পুঁজের মতো লক্ষণও দেখা যেতে পারে।
আরো জানুন: বুক জ্বালাপোড়া? পেট ফোলা? গ্যাস ও অ্যাসিডিটির ঘরোয়া সমাধান
স্ক্যাবিস কিভাবে ছড়ায়?
স্ক্যাবিস মূলত ত্বকের সাথে ত্বকের সরাসরি, দীর্ঘক্ষণ সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে ছড়ায়। এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ।
পারিবারিক সদস্য: পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে খুব সহজেই অন্য সদস্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ: যেমন - আলিঙ্গন, হাত ধরা, খেলাধুলা ইত্যাদির মাধ্যমে।
যৌন সম্পর্ক: স্ক্যাবিসকে যৌনবাহিত রোগ (STD) হিসেবেও বিবেচনা করা হয় কারণ যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে এটি ছড়াতে পারে।
সংক্রমিত জিনিসপত্র: বিরল ক্ষেত্রে, আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত পোশাক, বিছানার চাদর, তোয়ালে বা আসবাবপত্র থেকেও মাইট ছড়াতে পারে, তবে মাইট মানবদেহ ছাড়া ৪৮-৭২ ঘণ্টার বেশি বাঁচতে পারে না। ক্রাস্টেড স্ক্যাবিসের ক্ষেত্রে এ থেকে ছড়ানোর ঝুঁকি বেশি।
জনাকীর্ণ পরিবেশ: স্কুল, ডে-কেয়ার সেন্টার, নার্সিং হোম, হাসপাতাল এগুলোর মতো জনাকীর্ণ স্থানে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতিরোধ এবং চিকিৎসা
স্ক্যাবিস প্রতিরোধের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো মেনে চলা জরুরি:
দ্রুত চিকিৎসা: স্ক্যাবিসের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন এবং সম্পূর্ণ চিকিৎসা নিন।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত কাপড়, বিছানার চাদর, তোয়ালে গরম জলে ধুয়ে উচ্চ তাপে শুকিয়ে নিন। যে জিনিসপত্র ধোয়া সম্ভব নয়, সেগুলি একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে অন্তত ৭২ ঘণ্টা মুখ বন্ধ করে রাখুন। এতে মাইটগুলি অক্সিজেনের অভাবে মারা যাবে।
একসাথে চিকিৎসা: পরিবারের সকল সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে আসা ব্যক্তিদের একসাথে চিকিৎসা করানো উচিত, এমনকি যদি তাদের লক্ষণ না থাকে। এতে পুনঃসংক্রমণ রোধ করা যায়।
চুলকানো এড়িয়ে চলুন: অতিরিক্ত চুলকানোর ফলে ত্বকে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে এবং ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। নখ ছোট রাখুন।
স্ক্যাবিসের ঘরোয়া প্রতিকার
ঘরোয়া প্রতিকার স্ক্যাবিসের মূল চিকিৎসা নয়, বরং এটি উপসর্গ উপশমে এবং দ্রুত আরোগ্যে সাহায্য করতে পারে। মাইট সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ ব্যবহার করা অত্যাবশ্যক।
১. নীম পাতা
নীমের অ্যান্টিসেপটিক উপাদান মাইট ধ্বংসে সাহায্য করে
নীমপাতা বেটে আক্রান্ত স্থানে লাগান অথবা নীমপাতা সিদ্ধ করে গোসল করুন
২. টি ট্রি অয়েল (Tea Tree Oil)
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক
পানি বা নারকেল তেলের সঙ্গে মিশিয়ে আক্রান্ত স্থানে দিন
৩. অ্যালোভেরা:
অ্যালোভেরা ত্বকের জ্বালা কমাতে এবং শীতল প্রভাব দিতে সাহায্য করে। এটি চুলকানি উপশমে কার্যকর। সরাসরি অ্যালোভেরা জেল আক্রান্ত স্থানে লাগাতে পারেন।
৪. পরিষ্কার পোশাক ও বিছানা:
প্রতিদিন পরিষ্কার কাপড় এবং বিছানার চাদর ব্যবহার করুন। ব্যবহৃত কাপড় গরম জলে ধুয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে নিন।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:
ঘরোয়া প্রতিকারগুলি কেবল সাময়িক আরাম দিতে পারে। স্ক্যাবিসের সঠিক এবং সম্পূর্ণ চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সঠিক চিকিৎসা না হলে স্ক্যাবিস বারবার ফিরে আসতে পারে এবং এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আপনার যদি স্ক্যাবিসের লক্ষণ থাকে, তবে দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করুন।

কোন মন্তব্য নেই