ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের সহজ, প্রাকৃতিক ও কার্যকর উপায়
![]() |
| ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ঘরোয়া ও প্রাকৃতিক উপায়। |
আজকের দিনে ডায়াবেটিস এক সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষ এই রোগে ভুগছেন। কিন্তু অনেকেই জানেন না, ডায়াবেটিস কী, কেন হয় এবং কিছু ঘরোয়া পদ্ধতিতে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চলুন জেনে নেওয়া যাক বিস্তারিত।
ডায়াবেটিস কী?
ডায়াবেটিস হলো এমন একটি রোগ যেখানে শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না, অথবা ইনসুলিন ঠিকভাবে কাজ করে না। ফলে রক্তে গ্লুকোজ (চিনি) এর মাত্রা বেড়ে যায়। এটি দুই ধরণের হয়ে থাকে:
টাইপ-১ ডায়াবেটিস: শরীর ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। সাধারণত ছোটবেলায় ধরা পড়ে।
টাইপ-২ ডায়াবেটিস: শরীর ইনসুলিন তৈরি করলেও তা সঠিকভাবে কাজ করে না। এটি প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে বেশি দেখা যায়।
ডায়াবেটিস কেন হয়?
ডায়াবেটিস হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ জড়িত
বংশগত কারণ: পরিবারের কারো ডায়াবেটিস থাকলে আপনার ডায়াবেটিস হবার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন: অতিরিক্ত ওজন ইনসুলিনের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা: নিয়মিত ব্যায়ামের অভাবে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত চিনি, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
বয়স: বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে, বিশেষ করে ৪৫ বছরের পর।
উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরল: এই সমস্যাগুলো ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
কিছু ঔষধ: কিছু নির্দিষ্ট ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ডায়াবেটিস হতে পারে।
ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণসমূহ:
ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলো প্রায়শই ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় এবং অনেকে প্রাথমিক পর্যায়ে তা বুঝতে পারেন না। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
• অতিরিক্ত তৃষ্ণা
• ঘন ঘন প্রস্রাব বিশেষ করে রাতে
• অতিরিক্ত ক্ষুধা
• কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
• ক্লান্তি ও দুর্বলতা
• দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা
• ক্ষত নিরাময় হতে দেরি হওয়া
• ত্বকে চুলকানি বা সংক্রমণ
• হাত বা পায়ের অসাড়তা বা ঝিনঝিন করা
ডায়াবেটিসের ঘরোয়া প্রতিকার ও নিয়ন্ত্রণ:
ডায়াবেটিস সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব না হলেও, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং কিছু ঘরোয়া প্রতিকার দ্বারা এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে, যেকোনো ঘরোয়া প্রতিকার শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস:
শর্করা নিয়ন্ত্রণ: চিনি ও চিনিযুক্ত পানীয় ত্যাগ করুন। কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের পরিমাণ সীমিত করুন এবং জটিল কার্বোহাইড্রেট যেমন - গোটা শস্য, শস্যদানাযুক্ত রুটি ও ব্রাউন রাইস বেছে নিন।
ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার: শাকসবজি, ফল (সীমিত পরিমাণে), ডাল এবং বাদাম বেশি করে খান। ফাইবার রক্তে শর্করার শোষণ ধীর করে।
স্বাস্থ্যকর চর্বি: অলিভ অয়েল, অ্যাভোকাডো, বাদাম ও বীজে পাওয়া স্বাস্থ্যকর চর্বি গ্রহণ করুন।
প্রোটিন: চর্বিহীন মাংস, মাছ, ডিম ও ডাল প্রোটিনের ভালো উৎস।
নিয়মিত ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি ধরনের ব্যায়াম যেমন - দ্রুত হাঁটা, জগিং, সাঁতার বা সাইক্লিং করুন। এটি ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করে।
ওজন নিয়ন্ত্রণ: যদি আপনার অতিরিক্ত ওজন থাকে, তবে ওজন কমানো ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পর্যাপ্ত ঘুম: প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানো জরুরি। ঘুমের অভাব ইনসুলিনের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে।
কিছু ভেষজ ও মশলা:
নিম: নিমের পাতা রক্তে শর্করা কমাতে সাহায্য করে। সকালে খালি পেটে নিমের রস পান করতে পারেন।
মেথি: মেথি ভেজানো পানি বা মেথির গুঁড়ো রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
দারুচিনি: দারুচিনি ইনসুলিনের সংবেদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে। চায়ে বা খাবারে দারুচিনি গুঁড়ো ব্যবহার করতে পারেন।
করলা: করলার রস বা করলার তরকারি রক্তে শর্করা কমাতে কার্যকর।
আমলকী: আমলকী ভিটামিন সি-এর ভালো উৎস এবং এটি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
পর্যাপ্ত পানি পান: পর্যাপ্ত পানি পান শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে এবং অতিরিক্ত গ্লুকোজ বের করে দিতে সাহায্য করে।
শেষ কথা:
ডায়াবেটিস একটি গুরুতর রোগ হলেও সঠিক জীবনযাপন এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে তা সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সুস্থ জীবনধারা গ্রহণ করে এবং উপরোক্ত ঘরোয়া প্রতিকারগুলো অনুসরণ করে আপনি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে এবং একটি সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন ইনশাআল্লাহ।

কোন মন্তব্য নেই